এ.আর.ইমরান
দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদনে লোকসান এবং প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ ওষুধ কোনো সাধারণ পণ্য নয়—এটি মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই সংকটকে শুধু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া বা বাজারদরের বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি হয়তো আড়ালেই থেকে যাবে।
আমার দৃষ্টিতে, প্রথমেই খতিয়ে দেখা দরকার—বাংলাদেশে একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনে প্রকৃত খরচ কত এবং একই মান ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড বজায় রেখে বিদেশ থেকে আমদানি করলে মোট ব্যয় কত দাঁড়ায়। যদি দেখা যায়, কোনো ওষুধ দেশে উৎপাদন করতে গিয়ে কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, কর, ব্যাংকিং খরচ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক খরচ যোগ হয়ে আমদানির তুলনায় বেশি পড়ে, তাহলে বিষয়টি বাস্তব অর্থনীতির দৃষ্টিতে নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দেশীয় শিল্প অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। কিন্তু শুধু ‘দেশে উৎপাদন হচ্ছে’—এই যুক্তিতে এমন কোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা উচিত নয়, যার ফলে সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা—সব পক্ষকেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। একইভাবে, কেবল সস্তা আমদানির ওপর নির্ভর করাও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট, যুদ্ধ, মহামারি বা কূটনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কোনো সময় ওষুধের আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তাই প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত মধ্যপন্থা। যেসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ দেশে উৎপাদন করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। আর যেসব ওষুধ দেশে উৎপাদন করলে অস্বাভাবিক ব্যয় হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মান ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে আমদানির সুযোগ রাখা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, হয়রানি, অস্বচ্ছতা এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতার প্রভাব কতটা? একটি প্রতিষ্ঠান যদি উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্তরে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, অনিয়ম বা দুর্নীতির চাপ বহন করে, তাহলে তার উৎপাদন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এতে দেশীয় শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলোও আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান চলে যাওয়ার পেছনে কারণ এক নয়; তবে ব্যবসার পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও পরিচালন ব্যয়—এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তাই বিনিয়োগ ও উৎপাদন ধরে রাখতে হলে শুধু কর-সুবিধা দিলেই হবে না; একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে বাজারে সংকট তৈরি হতে পারে, দাম বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকারকে আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোন ওষুধ দেশে উৎপাদন করা হবে, কোনটি আমদানি করা হবে এবং কোন ওষুধের উৎপাদনকে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।
শেষ কথা হলো, দেশীয় উৎপাদন বনাম আমদানি—এটিকে দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে কোন পদ্ধতিতে জনগণ নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী ওষুধ পাবে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা। আর যদি কোনো খাতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অদক্ষতা দায়ী থাকে, তাহলে শুধু উৎপাদন বন্ধ বা আমদানির সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে সেই সমস্যার সমাধান করা জরুরি।
ওষুধের বাজারে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে একদিকে দেশীয় শিল্প টিকে থাকবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার সুযোগ পাবে।