Logo
প্রিন্টের তারিখ: 07 September 2026 | প্রকাশের তারিখ: Sep 7, 2026

সংবাদ শিরোনাম : অটো-রিকশা: চাকা খুলে যাওয়ার আগে আমরা কি সমস্যাটা দেখেছি?

অটো-রিকশা: চাকা খুলে যাওয়ার আগে আমরা কি সমস্যাটা দেখেছি?


এ.আর. ইমরান

সেদিন হাইওয়েতে অটো-রিকশায় যাচ্ছিলাম। গন্তব্যে পৌঁছাতে আর বেশি দেরি নেই। হঠাৎ বিকট শব্দ—পেছনের বাঁ পাশের চাকাটি খুলে গেল!

তারপর?

তারপরের গল্পটা কয়েক সেকেন্ডের। অটো কাত হলো, উল্টে গেল। দু-তিনজন আহত হলেন। আমিও ব্যথা পেলাম। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে যাত্রা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক, সেটিই মুহূর্তে পরিণত হলো দুর্ঘটনায়।

সেদিন একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বুঝেছিলাম—সড়ক দুর্ঘটনা অনেক সময় ‘দুর্ঘটনা’ হওয়ার আগেই দুর্ঘটনা হয়ে যায়।

চাকা খুলে যাওয়ার আগেই হয়তো সেটি ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়নি। অটোটি রাস্তায় ওঠার আগেই হয়তো নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেউ করেনি। চালক হয়তো জানতেন না, যন্ত্রটির কোথায় সমস্যা। আর আমরা যাত্রীরা? আমরা তো শুধু ভাড়া দিয়ে উঠে বসেছিলাম।

এবার প্রশ্নটা বড় করে করা যাক।

অটো-রিকশা কি সত্যিই আমাদের সড়কের মূল সমস্যা? নাকি অটো-রিকশাকে যেভাবে ব্যবস্থাপনার বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে, সমস্যাটা সেখানে?

বাংলাদেশে লাখো মানুষ প্রতিদিন অটো-রিকশা, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের ওপর নির্ভর করেন। শ্রমিক কর্মস্থলে যান, শিক্ষার্থী স্কুলে যায়, রোগী হাসপাতালে যান, কৃষক বাজারে যান। অনেক এলাকায় এসব বাহন ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন চলাচল প্রায় অচল।

অন্যদিকে একই অটো যখন মহাসড়কে বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে, যত্রতত্র দাঁড়ায়, ভুল লেনে ঢোকে কিংবা হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠায়-নামায়—তখন সেটিই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

তাহলে অটো বন্ধ করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান?

একটু থামুন।

যে মানুষটি প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দূরের বাজারে অটোতে যান, তাঁর জন্য বিকল্প কী?

যে শিক্ষার্থী অটোতে করে স্কুলে যায়, তার জন্য নিরাপদ পরিবহন কোথায়?

যে রোগী রাতের বেলায় হাসপাতালে যাবেন, তাঁর সামনে কি বাসের সময়সূচি হাতে থাকবে?

নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সহজ। বিকল্প তৈরি করাই আসল পরীক্ষা।

হাইওয়ে আর পাড়া-মহল্লার রাস্তা এক নয়

একটি জাতীয় মহাসড়ক আর একটি ইউনিয়ন সড়ককে একই নিয়মে দেখার কোনো যুক্তি নেই।

হাইওয়েতে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যান চলাচল করে। সেখানে ধীরগতির অটো-রিকশার অবাধ চলাচল স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি বাড়ায়।

তাই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও দ্রুতগতির করিডোরে অটো-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু স্থানীয় ও ফিডার সড়কে নির্দিষ্ট রুটে এসব যান চলাচলের সুযোগ থাকতে পারে।

অর্থাৎ নীতি হতে হবে—সব জায়গায় নিষেধ নয়, যেখানে ঝুঁকি সেখানে নিয়ন্ত্রণ।

একটি অটোর পরিচয় কি রাষ্ট্র জানে?

আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে।

কোন এলাকায় কতটি অটো চলছে? কতটি নিবন্ধিত? কতজন চালকের বৈধ লাইসেন্স আছে? কোন অটোর মালিক কে?

অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়।

যে যানটির পরিচয় রাষ্ট্রের খাতায় নেই, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে কীভাবে?

তাই অটো-রিকশা ও ইজিবাইককে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। চালকের পরিচয়, মালিকানা, রুট—সবকিছুর একটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার থাকতে পারে।

দুর্ঘটনা ঘটলে তখন ‘অটোটি কার?’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না।

চালক শুধু চালাবেন, নাকি বুঝেও চালাবেন?

স্টিয়ারিং ঘোরাতে পারলেই চালক হওয়া যায়—এ ধারণা বদলাতে হবে।

যাত্রী পরিবহনের আগে ট্রাফিক আইন, সড়ক সংকেত, নিরাপদ ওভারটেকিং, পথচারীকে অগ্রাধিকার এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো বিষয়ে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ থাকা দরকার।

কারণ দুর্ঘটনার মুহূর্তে চালকের হাতে কয়েক সেকেন্ড থাকে। সেই কয়েক সেকেন্ডে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত জীবন বদলে দিতে পারে।

আর আমার সেই অটোর চাকাটি?

এখানেই ফিরে আসি সেই দিনের ঘটনায়।

চালক যত দক্ষই হোন, যদি চলন্ত অবস্থায় চাকা খুলে যায়, তাহলে দক্ষতারও সীমা আছে।

তাই অটোর ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং, টায়ার, আলো, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আমরা মোবাইল ফোন কেনার সময় ক্যামেরা কত মেগাপিক্সেল তা দেখি, কিন্তু যে অটোতে প্রতিদিন মানুষের জীবন উঠছে, তার ব্রেক ঠিক আছে কি না—সেটা কে দেখে?

প্রশ্নটি একটু অস্বস্তিকর। কিন্তু প্রয়োজনীয়।

অটোকে সরাব, নাকি সমস্যাকে?

অটো-রিকশার সঙ্গে শুধু যাত্রী নয়; চালক, মালিক, মেকানিক, ব্যাটারি ব্যবসায়ীসহ একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকা জড়িত।

তাই একদিনের অভিযানে হাজার হাজার যান সরিয়ে দিলে সমস্যার একটি অংশ হয়তো চোখের আড়ালে যাবে, কিন্তু মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নটি থেকে যাবে।

ঝুঁকিপূর্ণ যান ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা যেতে পারে। চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সহজ ঋণ বা কিস্তির মাধ্যমে নিরাপদ যান কেনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

শহরে নির্দিষ্ট রুট ও স্টপেজ থাকতে পারে। যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করতে হবে। ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য অনুমোদিত ও নিরাপদ চার্জিং স্টেশন গড়ে তুলতে হবে।

অভিযান নয়, ব্যবস্থাপনা

দুর্ঘটনা হলো, অভিযান হলো, কিছু অটো আটক হলো, কয়েক দিন রাস্তা শান্ত—তারপর আবার আগের দৃশ্য।

এভাবে কি কোনো পরিবহনব্যবস্থা চলে?

একই সমস্যার জন্য যদি বারবার অভিযান চালাতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি অভিযানে নয়—ব্যবস্থাপনায়।

আমাদের দরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি।

কোন সড়কে কোন যান চলবে, কতটি চলবে, কোথায় থামবে, কে চালাবে, যানটির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসবের স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।

কারণ মানুষ অটো-রিকশার পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। মানুষ আসলে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সহজ যাতায়াতের পক্ষে।

সুতরাং অটো-রিকশাকে শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং তাকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।

হাইওয়েতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সড়কে পরিকল্পিত চলাচল, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের কারিগরি পরীক্ষা, নির্দিষ্ট রুট-স্টপেজ এবং নিরাপদ চার্জিং ব্যবস্থা—এসব একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।

শেষ কথা খুব সরল।

আমার অটোর চাকা সেদিন খুলে গিয়েছিল কয়েক সেকেন্ডে। কিন্তু অটো-রিকশা নিয়ে আমাদের নীতির ‘চাকা’ যেন বছরের পর বছর ধরে খুলেই পড়ে আছে।

সেই চাকা এবার মেরামত করা দরকার।

কারণ সমাধান অটো উচ্ছেদ নয়।
সমাধান হলো—অটোকে নিরাপদ করা, নিয়ন্ত্রণে আনা এবং পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে পরিকল্পিত করা।

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরুক—অটোর চাকা খুলে যাওয়ার পর নয়, চাকা খোলার আগেই।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক এই সময়ের
সকল কারিগরি সহায়তায়ঃ দৈনিক এই সময়ের
🖨️ প্রিন্ট 💾 JPG 📄 PDF