কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের সঙ্গে বন্ধুত্ব, আবেগের আদান-প্রদান কিংবা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। প্রযুক্তির এই নতুন ব্যবহার নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের আশঙ্কায় এআই সঙ্গীসেবার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চীন।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বিধিমালায় মানুষের মতো আচরণ করে দীর্ঘ সময় আবেগঘন যোগাযোগ চালিয়ে যেতে সক্ষম এআই সেবাগুলোর জন্য একাধিক শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা এবং এআইয়ের প্রতি অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরশীলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভার্চ্যুয়াল প্রেম নিষিদ্ধ
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের ভার্চ্যুয়াল প্রেমিক-প্রেমিকা, জীবনসঙ্গী কিংবা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে তৈরি এআই সেবা ব্যবহারের সুযোগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের মানুষের মতো কথোপকথনে সক্ষম এআই সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এআই সঙ্গী ব্যবহারে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারকারীদের জানাতে হবে যে তারা কোনো বাস্তব মানুষের সঙ্গে নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলছেন।
এআই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত থাকার বিষয়েও সতর্ক করতে হবে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দুই ঘণ্টা পর ব্যবহারকারীকে অনলাইনে কাটানো সময় সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
এআইয়ের প্রতি আসক্তি কমানোই অন্যতম লক্ষ্য
চীনা কর্তৃপক্ষের মতে, মানুষের আবেগ অনুকরণ করতে সক্ষম প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এআই সেবাগুলো যেন ব্যবহারকারীর মধ্যে অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরতা বা আসক্তি তৈরি না করে, সে বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় ব্যবহারকারীকে আত্মক্ষতি বা আত্মহত্যায় উৎসাহিত করা এবং ক্ষতিকর আচরণে প্ররোচিত করার মতো বিষয়ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে।
এদিকে, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে ও পরে চীনের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের এআই সহকারীর কিছু সঙ্গীসুলভ সুবিধা বন্ধ বা সীমিত করেছে। এর ফলে এআইয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আবেগঘন যোগাযোগ চালিয়ে আসা কিছু ব্যবহারকারীও এসব সেবা হারানোর মুখে পড়েছেন।
একাকিত্ব কি এআই সম্পর্কের জনপ্রিয়তার কারণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব জীবনে একাকিত্ব, সামাজিক যোগাযোগের অভাব কিংবা মনের কথা ভাগাভাগি করার মতো মানুষের অনুপস্থিতি অনেককে এআই সঙ্গীর দিকে আকৃষ্ট করছে। এআই চ্যাটবট সহজে কথা বলে, দ্রুত উত্তর দেয় এবং ব্যবহারকারীর অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ফলে কারও কারও কাছে এটি মানসিক সঙ্গীর বিকল্প হয়ে উঠছে।
তবে এ ধরনের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাস্তব জীবনের বন্ধুত্ব, পারিবারিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে বাস্তব সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
জন্মহার নিয়েও রয়েছে আলোচনা
চীনে দীর্ঘদিন ধরে জন্মহার কমে যাওয়া এবং জনসংখ্যার বার্ধক্য একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এআই সঙ্গীর জনপ্রিয়তা তরুণদের বাস্তব প্রেম, বিয়ে ও পরিবার গঠনের আগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
তবে নতুন বিধিমালার ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীদের মানসিক সুরক্ষা, শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা এবং এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। জন্মহারসংক্রান্ত উদ্বেগ এই নীতির অন্যতম কারণ কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা থাকলেও বিষয়টিকে সরকারের ঘোষিত একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরনও বদলাচ্ছে। চীনের এই পদক্ষেপ সেই পরিবর্তনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখন প্রশ্ন, এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, আর সেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।
সূত্র: চীনের সাইবারস্পেস প্রশাসনের বিধিমালা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অবলম্বনে।
প্রিন্ট করুন ফটো কার্ড